শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ

Spread the love

শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়। এই সময়ের পটভূমিতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে অভিহিত করা হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংগ্রাম চূড়ান্ত সফলতা লাভ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাথমিক জীবন এবং রাজনৈতিক কেরিয়ার

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু হয় স্থানীয় মাদ্রাসায় এবং পরে তিনি কলকাতার সূর্য সেন কলেজে পড়াশোনা করেন। মুজিবের রাজনৈতিক সচেতনতা শুরু হয় ছাত্রাবস্থায়। তিনি ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করেন।

শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনের প্রথম থেকেই বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, যা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেতে সাহায্য করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যেখানে তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তাঁর এই ভাষণ ছিল মুক্তিযুদ্ধের অগ্রবর্তী সংকেত।

পাকিস্তান সরকার, বিশেষত ইস্ট পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) এর সাথে তাদের অবিচার এবং বঞ্চনার কারণে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছিল, কিন্তু পাকিস্তান সরকার সে সময়ের ফলাফল মেনে নেয়নি। এর ফলস্বরূপ, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা শহরের উপর আক্রমণ শুরু করে, যা ছিল শুরু একটি নৃশংস গণহত্যার। এর পর থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চলতে থাকে যুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই সাধারণ জনগণ, সেনাবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধারা একত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। দেশব্যাপী হাজার হাজার শহিদ মুক্তিযোদ্ধার আত্মবলিদানে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহায্যও এ সময়ে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারত সরকারও একযোগভাবে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন প্রদান করে এবং ৩ নভেম্বর ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিব

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তার নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং পুনর্গঠন শুরু হয়।

শেখ মুজিবের অবদান

শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি জাতির নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের স্বাধীনতার প্রতীক। তিনি জাতিকে একত্রিত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গণতন্ত্র, অধিকার এবং সমতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশকে পুনর্গঠন, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থার উন্নতি ঘটানোর জন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তবে, তার শাসনামলে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে তাকে একটি নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে হত্যা করা হয়, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংগ্রাম আজও বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত।

উপসংহার

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের খোঁজ, যা বহু মানুষকে একত্রিত করে দেশের জন্য এক নতুন ভবিষ্যতের সৃষ্টি করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই যুদ্ধের প্রধান নেতা এবং তার নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। আজও তার সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং দেশপ্রেম বাংলাদেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।


Spread the love

Leave a Comment